Your right to know · Her byline

Personal edition

Tamanna Maria

Reporter at The Daily Star

Education · Society · Environment · English & Bangla

FRIDAY, 9 OCTOBER 2026

Back to the edition

নারীর কর্মজীবনে বড় অন্তরায় সন্তানের জন্য ডে-কেয়ার সংকট

‘পরিবার ও সন্তানের কথা ভেবে শেষ পর্যন্ত চাকরির চিন্তা বাদ দিতে হয়েছিল।’

তামান্না ইয়াসমিন মারিয়া, মহিউদ্দিন আলমগীর· 10/2/2026· Bangla
ডে-কেয়ার
নারীর কর্মজীবনে বড় অন্তরায় সন্তানের জন্য ডে-কেয়ার সংকট

লাখো নারীর জন্য চাকরি খোঁজা কিংবা চাকরি করার ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা হয়ে দাঁড়ায় সন্তানদের নিরাপদে রাখার মতো একটি জায়গা খুঁজে পাওয়া।

৩২ বছর বয়সি নুসরাত জাহানের কথাই ধরা যাক। তার প্রথম সন্তানের বয়স যখন আড়াই বছর, তখন একটি স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু, স্কুলে ক্লাস নেওয়ার সময়টুকুতে সন্তানকে কোথায় এবং কার কাছে রেখে যাবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন।

তার বাসা গাবতলী। বাসা থেকে সবচেয়ে কাছের সরকারি ডে-কেয়ার সেন্টারটি মিরপুর ১০ নম্বরে—প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে। বাসার কাছাকাছি যেসব বেসরকারি ডে-কেয়ার সেন্টারের খোঁজ তিনি পেয়েছিলেন, সেগুলোর খরচ তার সামর্থ্যের বাইরে।

দ্য ডেইলি স্টারকে নুসরাত বলেন, ‘পরিবার ও সন্তানের কথা ভেবে শেষ পর্যন্ত চাকরির চিন্তা বাদ দিতে হয়েছিল।’

বহু কর্মজীবী মায়ের বাস্তবতা নুসরাতের মতোই। সুবিধাজনক জায়গায় নির্ভরযোগ্য শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র না পেয়ে তাদের অনেককেই চাকরি ছেড়ে দিতে হয়, কিংবা সাময়িকভাবে কর্মজীবন থেকে দূরে থাকতে হয়।

২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা ২ কোটি ৩৬ লাখ। অথচ সারা দেশে সরকারি ডে-কেয়ার সেন্টার রয়েছে মাত্র ৬৪টি, যেখানে মাত্র ৪ হাজারের কিছু বেশি শিশুর পরিচর্যার ব্যবস্থা রয়েছে।

তা ছাড়া, ডে-কেয়ার সেন্টারে একটি আসন পেতে কয়েক মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। কিছু সরকারি ডে-কেয়ার এমন প্রতিষ্ঠানের ভেতরে, যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশ কার্যত অসম্ভব। অন্য ডে-কেয়ারগুলো নিয়েও প্রচার-প্রচারণা কম। ফলে, অনেক অভিভাবক সেগুলো সম্পর্কে জানেন-ই না।

সচিবালয়ের ডে-কেয়ার সেন্টারের এক কর্মী বলেন, সচিবালয়ে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রিত। যার ফলে এই ডে-কেয়ারটি কার্যত সবার জন্য উন্মুক্ত না। এ ছাড়া, সচিবালয়ের কর্মচারীদের সন্তানদেরই এখানে জায়গা দিতে হিমশিম খেতে হয়। ৫০ আসনের এই ডে-কেয়ারে কখনো কখনো ৭০-৮০টি আবেদন জমা পড়ে।

নারী অধিকারকর্মীরা মনে করেন, ডে-কেয়ার সুবিধাকে কেবল নারীর ক্ষমতায়নের জন্য একটি কর্মসূচি হিসেবে দেখা উচিত নয়। দ্রুত নগরায়ণের বর্তমান বাস্তবতায় এ ধরনের সুবিধা আরও বেশি প্রয়োজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক তানিয়া হক বলেন, একজন নারী কাজে গেলে তার সন্তানের দেখাশোনা কে করবেন, এই প্রশ্নটিই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এর জন্যই ডে-কেয়ার সেন্টার জরুরি। সামাজিক অবস্থান যা-ই হোক না কেন, প্রত্যেক নারীকেই এই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।

তিনি বলেন, ‘আগে বাংলাদেশে যৌথ পরিবার বেশি ছিল। এখন একক পরিবার বেড়েছে। এমন পারিবারিক কাঠামোয় একজন কর্মজীবী মায়ের জন্য সন্তানের দেখাশোনা করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।’

শিশু অধিকার বিশেষজ্ঞ লায়লা খন্দকার বলেন, বাংলাদেশে ডে-কেয়ার সেন্টার নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই।

তিনি উল্লেখ করেন, ঢাকায় লাখো কর্মজীবী পরিবার বসবাস করলেও সাশ্রয়ী ডে-কেয়ার সুবিধা এখনো অপ্রতুল। অন্যদিকে, মানসম্মত বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর খরচ অনেক পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে।

তীব্র সংকট

৬৪টি সরকারি ডে-কেয়ার সেন্টারের মধ্যে ৪৪টি পরিচালিত হয় নিজস্ব আয়ে। এসব ডে-কেয়ারে আসন রয়েছে ২ হাজার ৮৩০টি। বাকি ২০টি পরিচালিত হয় মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের প্রকল্পের অর্থায়নে, যেখানে আসন সংখ্যা ১ হাজার ২০০টি। সবমিলিয়ে এসব কেন্দ্রে অফিস চলাকালে ১৫ দিন থেকে ছয় বছর বয়সি মোট ৪ হাজার ৩০টি শিশুকে ডে-কেয়ার সেবা দেওয়া হয়।

নিজস্ব আয়ে পরিচালিত কেন্দ্রগুলোতে নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুদের পরিচর্যার জন্য মাসে ১০০ টাকা এবং মধ্যম আয়ের পরিবারের শিশুদের জন্য ৫০০ টাকা দিতে হয়। ছয় মাস থেকে ছয় বছর বয়সি শিশুদের ভর্তির সময় আরও ৫০০ টাকা করে ফি নেওয়া হয়।

প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত কেন্দ্রগুলোতে এককালীন ভর্তি ফি ২০০ থেকে ৫০০ টাকা। তবে শিশুর বয়স ও অভিভাবকের আয়ের ভিত্তিতে মাসিক ফি ভিন্ন হয়। ৪ থেকে ১২ মাস বয়সি শিশুদের জন্য অভিভাবকদের মাসে ২০০ থেকে ২ হাজার টাকা; ১২ থেকে ৩০ মাস বয়সিদের জন্য ১৫০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা; ৩০ থেকে ৪৮ মাস বয়সিদের জন্য ১২০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা এবং ৪৮ থেকে ৬০ মাস বয়সিদের জন্য ১০০ থেকে ১ হাজার টাকা দিতে হয়।

এসব কেন্দ্রে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সহায়তার জন্য সুষম পুষ্টি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রাক্‌-প্রাথমিক শিক্ষা, খেলাধুলা ও বিনোদনমূলক কার্যক্রমের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর ও ঢাকার সরকারি ডে-কেয়ার সেন্টারগুলোর কর্মকর্তারা দ্য ডেইলি স্টারকে জানিয়েছেন, এসব কেন্দ্রের আসন সংখ্যার চেয়ে ভর্তির আবেদন অনেক বেশি আসে।

লায়লা খন্দকার বলেন, ‘ঢাকা শহরে কর্মজীবী মায়ের সংখ্যা অনেক। অধিকাংশ সময় তাদের সবাইকে সুযোগ দিতে আমাদের হিমশিম খেতে হয়।’

ডে-কেয়ার সেন্টারের সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) শায়লা শারমিন জামান বলেন, সরকার ডে-কেয়ার সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে ৬০টি ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপনের একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।’

কর্মকর্তারা আরও একটি প্রচলিত ভুল ধারণার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘সরকারি ডে-কেয়ার সেন্টারগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত। কিন্তু, অনেকে মনে করেন, এসব কেন্দ্র কেবল সরকারি কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য।’

ঢাকায় অন্তত ১৪টি ডে-কেয়ার সেন্টার রয়েছে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভেতরে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে পরিকল্পনা কমিশন, বাংলাদেশ জাতীয় গ্রন্থাগার, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, সমবায় ভবন, পানি ভবন ও ভূমি ভবন।

আগারগাঁও এলাকার বাসিন্দা রাহেনা বেগম বলেন, তার আশপাশে কয়েকটি সরকারি ডে-কেয়ার সেন্টারে সাশ্রয়ী খরচে সন্তানদের রাখার সুযোগ আছে। এগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত। কিন্তু, তিনি এ বিষয়ে জানতেন না।

এসব ডে-কেয়ারের বিষয়ে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সরকারি ডে-কেয়ার সুবিধায় পর্যাপ্ত আসন না থাকায় অনেক পরিবারকে বেসরকারি কেন্দ্রে যেতে হয়। এসব কেন্দ্রের খরচ সরকারি কেন্দ্রের তুলনায় অনেক বেশি। অনেকে ক্ষেত্রে খরচ পাঁচ থেকে সাত গুণ পর্যন্ত বেশি হয়ে থাকে।

পল্লবীর সেফ ডে-কেয়ারের কর্মকর্তারা জানান, ছয় মাস থেকে ছয় বছর বয়সি শিশুদের সারাদিনের পরিচর্যার জন্য মাসে ৬ হাজার টাকা এবং অর্ধেক দিনের জন্য ৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়। কেন্দ্রটি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত চালু থাকে।

গুলশানের লে পতি চাইল্ড কেয়ার সেন্টারে সারাদিনের জন্য মাসে ৯ হাজার ৪০০ টাকা এবং অর্ধেক দিনের (৫ ঘণ্টা) জন্য ৮ হাজার টাকা ফি নেওয়া হয়। এখানে ছয় মাস থেকে ১০ বছর বয়সি শিশুদের ভর্তি করা হয়।

করণীয়

ডে-কেয়ার সেন্টারগুলোকে মানসম্মত ও সাশ্রয়ী হতে হবে উল্লেখ করে অধ্যাপক তানিয়া বলেন, ‘খরচ খুব বেশি হলে এসব ডে-কেয়ার সব নারীর আর্থিক সামর্থ্যের মধ্যে থাকবে না।’

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘নারীর ক্ষমতায়নের অন্যতম প্রধান সূচক হলো তার আয় ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। ডে-কেয়ার সেন্টার এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর এ জন্য সরকারি সহায়তা ও কারিগরি সহযোগিতা অপরিহার্য।’

৮ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে এক সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, ডে-কেয়ার সেন্টারগুলোর বর্তমান অবস্থা নিয়ে কারো সন্তুষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই। প্রকৃত চাহিদার তুলনায় এসব কেন্দ্রের সংখ্যা অনেক কম। ডে-কেয়ার সেন্টারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের কেন্দ্র স্থাপনের জন্য জায়গা বরাদ্দ দিতে মন্ত্রণালয় বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করছে।

তিনি বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ভবনে বিনামূল্যে জায়গা দেবে। আমরা আসবাবপত্র ও ডে-কেয়ার সেবাদানকারী কর্মী দেবো। একে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে অংশীদারত্ব বলা যেতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো, ঢাকা শহর, সাভার, টঙ্গী, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে অন্তত ১৫০টি নতুন ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন করা।’